আপন মমতায় শিশুর বিকাশ, আলোকিত হোক আগামীর পথচলা
একটি শিশু একটি স্বপ্ন। একটি সুস্থ শিশু সকল বাবা-মায়ের প্রত্যাশা।
সময়ের সাথে সাথে একটি শিশু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে
ধীরে ধীরে সে হয়ে ওঠে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। কিন্তু অনেক সময় এর
ব্যতিক্রমও ঘটতে দেখা যায়। অনেক শিশু নানা ধরনের প্রতিকূলতা নিয়ে
জন্মায়। এইসব সমস্যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিকার ও প্রতিরোধযোগ্য। একটু
সচেতনতা দিতে পারে শিশুকে সুস্থ সুন্দর অনাবিল প্রশান্তিময় জীবন। আজ
যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে আমরা তার জন্য একটি সুন্দর সাজানো
বাগান চাই। মা-বাবার ঘরটা হয়তো শিশুর জন্য সাজানো বাগান। কিন্তু
এই পৃথিবীকে আমরা কি তার জন্য সুন্দর সাজানো বাগানের মতো করতে
পেরেছি? অথবা সুকান্তের সেই বাসযোগ্য পৃথিবী? হয়তো পেরে উঠি না
আমরা; কিন্তু একটি শিশুকে আমরা যদি বড় করে তুলি আপন মমতায়,
সঠিক ও পূর্ণ বিকাশে তাহলে সে হয়তো তার পৃথিবীটাকে তার মনের মতো
করেই বাসযোগ্য করে তুলতে পারবে। মনের মতো সাজাবে তার আপন
পৃথিবী নামের বাগানটাকে।
আজকের সুস্থ-সবল ও বুদ্ধিদীপ্ত শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের কর্ণধার এই শিশুদের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক বুদ্ধি বিকাশে
পিতামাতা, পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মগ্রহণকারী শিশুকে নিজের ইচ্ছা, প্রভাব, স্বপ্ন চাপিয়ে
দেয়া ঠিক নয়। নামিদামি স্কুলে ভর্তি, ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার
বানাতে গিয়ে ব্যক্তিগত পারিবারিক সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট করে শিশুর
মানসিক শারীরিক বুদ্ধির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করবেন না।
শিশুদের নিয়ে কাজ করার একটা ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। কারণ
আমি যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিলাম তখন এই শিশুদের সাথে মিশতে গিয়ে
লক্ষ্য করি, প্রতিটি শিশুই স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্র্যময়। প্রত্যেককেই আবিষ্কার
করা যায়। তাদেরকে আমি শিখিয়েছি, তবে সত্যি বলতে আমিও তাদের
কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু শিশুর একাডেমিক দিকটাকেই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা
করা হয়। প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণœ রাখার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের উপর স্টিম
রোলার চালানো হয়। আমাদের সময় আমরা স্কুল থেকে পড়াশোনার বাইরে
অনেক কিছু শিখতাম। এখনকার স্কুলগুলোতে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিকতা,
মানসিক সঠিক বিকাশ, শারীরিক বিকাশের উপর তেমন উল্লেখযোগ্য
কোনো প্রোগ্রাম বা কর্মসূচি নেই। কিছু প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র কিছু কর্মসূচি বা
উদ্যোগ থাকলেও বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বিষয়ের কোনো গুরুত্বই
নেই। বর্তমান যান্ত্রিক-বস্তুবাদী সভ্যতা আমাদেরকে এতটাই যান্ত্রিক করে
ফেলেছে, এতটাই আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর করে তুলেছে যে, আমরা
নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছু কল্পনাই করতে পারি না। ছোটবেলা থেকেই
শিশুকে শেখানো হয়- ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। কোমল
মনগুলোতে এই কথা এমনভাবে গেঁথে যায় যে বড় হতে হতে তাদের
একমাত্র টার্গেট থাকে লেখাপড়া করে বাড়ি-গাড়ি করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত
হওয়া। এই উচ্চাকাক্সক্ষার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যা কিছু তাদের বাধা সৃষ্টি করে
তাই তারা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এহেন কাজ
নেই তারা করে না। বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে মনে হয়, যে যত
বেশি শিক্ষিত সে তত বেশি স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। এমন তো হওয়ার কথা
ছিল না। শিক্ষা হবে মানুষের কল্যাণে। শিক্ষা গ্রহণ করে জাতির কল্যাণে
কিভাবে ভূমিকা রাখা যায় সে বিষয়ে কাজ করা, চিন্তা ভাবনা করা, শিক্ষার
মূল টার্গেট হওয়ার কথা ছিল এটাই অথচ হচ্ছে ঠিক তার বিপরীত। আজ
দেশের সবচেয়ে বড় বড় দুর্নীতি হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় বড় শিক্ষিত
শ্রেণির লোকদের দ্বারা।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদেরকে ছোটবেলা থেকেই
এমনভাবে দেশপ্রেম শেখানো হয় যাতে, বড় হয়ে তাদেরকে দিয়ে কেউ শত
চেষ্টা করেও দেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করাতে না পারে। অথচ আমাদের
দেশে একশ্রেণির লোক স্বার্থ রক্ষার জন্য পুরো দেশ বিক্রি করতেও কুণ্ঠাবোধ
করেন না। তাই শিশুদের নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীতা অনস্বীকার্য।
এবার আসি চিকিৎসা পদ্ধতির কথায়। যদিও মৌলিক অধিকার খাদ্য,
বস্ত্র, বাসস্থানের পরেই চিকিৎসার স্থান। তবুও এই চিকিৎসার বিষয়টাও
এখন আর সেবার পর্যায়ে নেই। অনেকটাই ব্যবসায়িক পর্যায়ে চলে গেছে।
এইখানে সেবার দিকটা তেমন একটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয় না।
তবে আপনি যদি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে পারেন, তাহলে ভালো চিকিৎসাসেবা
পাবেন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ জনগণ যেহেতু দরিদ্রসীমার নিচে
বসবাস করে সেহেতু আমাদেরকে তাদের সবার কথা চিন্তা করে চিকিৎসা
সেবা দিতে হবে। কম খরচে কিভাবে ভালো চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় সেই
বিষয়ে ভাবতে হবে। পূর্বেই বলেছি যে, বড় হয়ে গাড়ি-বাড়ি করাই একমাত্র
লক্ষ্য যে শিশুদেরকে শেখানো হয় তারা কিভাবে সেবার কথা চিন্তা করবে?
তারা প্রথমে চিন্তা করে আর্থিকভাবে সে কতটুকু লাভবান হচ্ছে, তারপর
রোগীর সেবা বা সুস্থতার কথা চিন্তা করে। আজকাল চিকিৎসাও অর্থ দিয়ে
পরিমাপ করা হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, এই আমলাতান্ত্রিক চিকিৎসা
ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে শিশুরা।
তাই আমার ইচ্ছা হলো আমি এমন একটা প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা প্রতিষ্ঠা
করবো যার তত্ত¡াবধানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র,
ডে-কেয়ার এবং শিশুদের লালন পালনের সাথে সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা
বৃদ্ধির লক্ষ্যে সভা- সেমিনার, কর্মশালা ইত্যাদি প্রোগ্রাম পরিচালনা করবো।
সেই লক্ষ্যকে সামনে লেখে ‘আপন শিশু বিকাশ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি
ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছি। সেখানে ‘আপন চাইল্ড কেয়ার হোম’ নামে
একটি বিভাগ খোলা হয়েছে। যেখানে শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশে কাজ করে
যাচ্ছে একঝাঁক নিরলস পরিশ্রমী সেবাদানকারী মানুষ।
এই বইটিতে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি একটি শিশুর বিকাশের
প্রারম্ভিক ধাপগুলো এবং আমাদের অবিভাবকদের কোন কোন ভুলের
কারণে শিশু ও তার পরিবারের উপর নেমে আসে সীমাহীন ভোগান্তি তার
কিছু বাস্তব চিত্র।
শিশু মনোবিজ্ঞানী
ডা. সুলতানা রাজিয়া
চেয়ারম্যান, আপন শিশু বিকাশ ফাউন্ডেশন
পরিচালক, আপন চাইল্ড কেয়ার হোম
কনসালটেন্ট, প্রাইম হাসপাতাল মাইজদী নোয়াখালী।
প্রাক্তন কনসালটেন্ট, ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল কাকরাইল, ঢাকা